বাংলাদেশে ৭০ হাজার গৃহহীন পরিবারকে ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ উপহার

0
124

হাবিবুর রহমান, ঢাকা: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল দেশের কোনো মানুষ আশ্রয়হীন থাকবে না। পিতার সেই স্বপ্ন পূরণে মুজিববর্ষ উপলক্ষে সারাদেশের গৃহহীন-ভূমিহীনদের ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ উপহার দিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রায় ৭০ হাজার ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবার পেলেন আধাপাকা বাড়ি। যার মাধ্যমে মুজিববর্ষে পিতার স্বপ্ন পূরণের সারথী হিসাবে আরেকটি মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। শনিবার সকালে মুজিববর্ষ উপলক্ষে ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে জমি ও গৃহ প্রদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এদিন ৬৬ হাজার ১৮৯টি পরিবারকে ঘর বুঝিয়ে দেওয়া হবে। একযোগে এত ভূমিহীন-গৃহহীন মানুষকে জমি ও ঘর করে দেওয়ার ঘটনা বিশ্বে এটিই প্রথম।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই অনুষ্ঠানে তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে যুক্ত হন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং ৪৯২টি উপজেলা প্রান্ত ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে সংযুক্ত হয় অনুষ্ঠানে। এ সময় মুজিববর্ষে গৃহহীন-ভূমিহীনদের জমিসহ ঘর উপহার দেওয়ার কর্মসূচি বাস্তবায়নে সম্পৃক্ত সরকারের সকল স্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, যারা আশ্রয়ণ প্রকল্পের সঙ্গে জড়িৎ ছিলেন তাদের সকলের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, মুজিববর্ষে আমাদের অনেক কর্মসূচি ছিল। করোনাভাইরাসের কারণে সেগুলি আমরা করতে পারিনি । কিন্তু আজকে আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় উৎসব এটাই যে, গৃহহীন-ভূমিহীন মানুষকে আমরা ঘর দিতে পারলাম। এর থেকে বড় উৎসব বাংলাদেশে আর কিছু হতে পারে না। তিনি বলেন, এদেশের কোনো শ্রেণির মানুষ কিন্তু বাদ যাচ্ছে না। বেদে শ্রেণিকে ঘর করে দিচ্ছি। তাদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। হিজড়াদের আমরা স্বীকৃতি দিয়েছি, তাদেরকেও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যারা দলিত শ্রেণি বা ঢাকার সুইপার কলোনিতে থাকত তাদের জন্য ভালো এবং আধুনিক বাসভবন তৈরি করে দিচ্ছি আমরা। তিনি আরো বলেন, একটা ঠিকানা সমস্ত মানুষের জন্য করে দিবো। কারণ আমি বিশ্বাস করি, যখন এই মানুষগুলি নিজেদের ঘরে থাকবে, তখন আমার বাবা-মা যারা সারাজীবন ত্যাগ স্বীকার করেছেন দেশের জন্য, তাদের আত্মা শান্তি পাবে। লাখো শহীদ রক্ত দিয়ে দেশের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন, তাদের আত্মা শান্তি পাবে। এদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করাটাই তো ছিল আমার বাবার একমাত্র লক্ষ্য। কাজেই আজকে আমি সবচেয়ে খুশি যে এতো অল্প সময়ে এতোগুলি পরিবারকে আমরা একটা ঠিকানা দিচ্ছি। আর এই শীতের মধ্যে সকলে অন্তত ভালভাবে থাকতে পারবেন’ বলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। আমরা তো আমাদের যারা রিফিউজি তাদের জন্য ভাসানচরে ঘর করে দিয়েছি। ১৯৯১ সালে যখন খালেদা জিয়া ক্ষমতায় সেই সময় কক্সবাজার খুরুশকুলে যারা ঘুর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল তাদেরও আমি ফ্ল্যাট করে দিয়েছি। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যারা ক্ষতিগ্রস্থ তাদের জন্যও ঘর করে দিয়েছি এবং আরও ঘর তৈরি হবে। খুব শিগগিরই আরও ১০০টা বিল্ডিং সেখানে তৈরি হবে বলেও অবহিত করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এখানে আমরা ৬৬ হাজার ১৮৯টা ঘর করে দিলাম, আমরা আরও এক লাখ ঘর তৈরির কাজ খুব শিগগিরই শুরু করব। মুজিববর্ষ এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশে কোনো লোক গৃহহারা থাকবে না। মুজিববর্ষের অনেক কর্মসূচি আমাদের ছিল।সেগুলি আমরা করতে পারিনি করোনার কারণে। করোনা আমাদের জন্য যেমন অভিশাপ নিয়ে এসেছে আবার এই একদিকে আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। কারণ এই একটি কাজের দিকেই নজর দিতে পেরেছি। আমাদের আজকে এটাই বড় উৎসব যে গৃহহীন-ভূমিহীন মানুষকে আমরা ঘর দিতে পারলাম, এর থেকে বড় উৎসব আর কিছু বাংলাদেশে হতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর কাছে দোয়া কামনা করে বলেন, শুধু দোয়া চাই আপনাদের। যেন এদেশটাকে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসাবে গড়ে তুলতে পারি। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি মানুষ যেন সুন্দরভাবে বাঁচতে পারে, সুন্দরভাবে জীবন যাপন করতে পারে। তাদের জীবন যেন উন্নত হয়। বিশ্ব দরবারে আমরা বাঙালি হিসাবে মাথা উঁচু করে সম্মানের সঙ্গে যেন চলতে পারি, সেটাই আমার একমাত্র লক্ষ্য। এরপর সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মুজিববর্ষে গৃহহীন ও ভূমিহীনদের ঘরসহ জমি উপহার দেওয়ার কর্মসূচির উদ্বোধন ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী। তার পক্ষে সংশ্লিষ্ট সকলকে সারাদেশে গৃহহীন-ভূমিহীনদের একক ঘরের দলিল, খতিয়ান, ঘর দেওয়া সনদ হস্তান্তর করার জন্য অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, আপনারাই আমার পক্ষ থেকে সব গৃহহীন ভূমিহীন মানুষকে তাদের দলিল হস্তান্তর করে দেন।

প্রসঙ্গত, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ২০ ফ্রেবুয়ারি নোয়াখালী জেলার বর্তমানে লক্ষ্মীপুরের চরপোড়াগাছ গ্রাম পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি গৃহহীন মানুষের জন্য গৃহ নির্মাণের নির্দেশ দেন। তারই নির্দেশে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম শুরু হয় গৃহহীন পুনর্বাসন কার্যক্রম। পরে ১৯৭২ সালের ৩ জুন বাংলাদেশ জাতীয় সমবায় ইউনিয়ন আয়োজিত সমবায় সম্মেলনের বক্তব্যে অঙ্গীকার করেছিলেন, ‘আমার দেশের প্রতিটি মানুষ খাদ্য পাবে, আশ্রয় পাবে, শিক্ষা পাবে, উন্নত জীবনের অধিকারী হবে। এই হচ্ছে আমার স্বপ্ন। স্বপ্ন পূরণের পথে জাতির পিতার অগ্রযাত্রা থমকে যায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালো রাতে। তার সেই স্বপ্ন পূরণকেই ব্রত হিসেবে নিয়ে কাজ করে চলেছেন তারই কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১৯৯৬ সালে তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে জাতির পিতার অসমাপ্ত জনবান্ধব ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমগুলো পুরনায় চালু করেন। ১৯৯৭ সালের ২০ মে কক্সবাজার জেলার ঘূর্ণিঝড়ে আক্রান্ত মানুষদের দুর্দশা দেখতে কক্সবাজার পরিদর্শন করেন এবং গৃহহীন মানুষদের পুনর্বাসনের নির্দেশ দেন। তার নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে শুরু হয় আশ্রয়ণ প্রকল্প। সেই আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় ১৯৯৭ থেকে ২০২০ পর্যন্ত ৩ লাখ ২০ হাজার ৫২টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। পরবর্তী মেয়াদে ক্ষমতায় না আসতে পারলেও ২০০৯ সালে দ্বিতীয় দফায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই ফের শুরু করে সেই কার্যক্রম। সবশেষ জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের ঐতিহাসিক উপলক্ষ সামনে রেখে সরকার ঘোষণা করে ‘মুজিববর্ষ’। এই মুজিববর্ষেই দেশের গৃহহীন মানুষদের জন্য আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। সে অনুযায়ী প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। তারই প্রথম ধাপে ৬৬ হাজারেরও বেশি পরিবার বুঝে পাচ্ছে আশ্রয়।



আরো পোস্ট-     https://anmnews.in/?p=169872  

http://anmnews.in/?p=169890   

ANM NEWS WhatsApp Group| এখন দিনের টাটকা তাজা খবর আপনার হাতের কাছে পেতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন— https://chat.whatsapp.com/LnGqZu86Wei9CsNCSPuwBO